Barisal Report .Com । বরিশাল রিপোর্ট .কম

ঢাকা, ২২শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং


প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৯ , ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
নারী ভাষাসংগ্রামীদের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয়নি

অনলাইন ডেস্ক// ভাষার মাস অমর একুশে ফেব্রুয়ারি শুরু আজ। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলেছে বাঙালি। পাকিস্তানি জান্তার শোষণ-নিপীড়নের প্রথম আঘাত ছিল ‘বাংলা ভাষা’র ওপর। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২’র ২১ হয়ে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি- একটা দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এই সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন নারীরা।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ভাষা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন অনেক নারী। তারা রাস্তায় নেমেছেন, মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন, পোস্টার লাগিয়েছেন, আন্দোলন চালিয়ে নিতে অর্থ সংগ্রহ করেছেন, আহত হয়েছেন, আহত সতীর্থদের সেবা করেছেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি, আজও পূর্ণাঙ্গরূপে আসেনি তাদের অবদান।

নারী ভাষাসংগ্রামীদের নাম সেভাবে উচ্চারিত হয় না। এর মধ্যে সর্বজন পরিচিত মাত্র কয়েকজন। কিন্তু তাদের কথাও আসে খুব কম। রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন। অনেকেই ইতিমধ্যে নীরবে-নিভৃতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কারও কারও পাথেয় ছিল অঞ্চল বা এলাকাভিত্তিকভাবে মানুষের ভালোবাসা, সম্মান।ভাষাসংগ্রামী ও জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর আনিসুজ্জামান এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে যে ক’জন নারী ভাষাসংগ্রামী এগিয়ে গিয়েছিলেন তাদের কথা আমরা জানি। তাদের মধ্যে যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের কথা খুব একটা এখন আসে না। ড. সুফিয়া আহমেদের একটি সাক্ষাৎকারও তো দেখি না। নারী ভাষাসংগ্রামীদের নিয়ে গবেষণার অবকাশ রয়েছে।

ভাষা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট শুরু ১৯৪৭ সাল থেকে। ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা নিয়ে ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে ‘ভাষা আন্দোলন ও নারী’ শীর্ষক গবেষণালব্ধ পুস্তক প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। বইটিতে উল্লেখ আছে, ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট নাগরিকরা বাংলাকে এখানকার রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে স্মারকলিপি দেন তাতে অন্যদের সঙ্গে লীলা রায় এমএ (সম্পাদিকা, জয়শ্রী), আনোয়ারা চৌধুরী বিএবিটি (সেক্রেটারি, নিখিল বঙ্গ মোসলেম মহিলা সমিতি) স্বাক্ষর করেন।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু তা অগ্রাহ্য হওয়ায় এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগের তৎকালীন ‘বাংলা ভাষা’বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন সংগঠনের জন্য পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও তমদ্দুন মজলিসের যৌথ উদ্যোগে ২ মার্চ ফজলুল হক হলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের একটি সভা হয়। কামরুদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন আনোয়ারা খাতুন ও লিলি খান। একই বছর গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদেরও অন্যতম সদস্য ছিলেন তারা। ওই বছরের ১১ মার্চের ভাষা আন্দোলনেও নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। ওই আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বেগজাদী মাহমুদা নাসিরের কথামালায় সেগুলো উঠে আসে। তখন আন্দোলন ছিল মূলত অবরোধ ও পিকেটিং। লুলু বিলকিস বানু, মেহেরুন্নিসা, লায়লা, সামসুন্নাহার, মমতাজসহ আরও অনেকে ছিলেন এবং ঢাকায় সেটাই মেয়েদের প্রথম আন্দোলন ছিল। ভাষা সংগ্রাম নিয়ে গবেষণা করছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উপস্থাপিত বাংলা ভাষার স্বীকৃতির প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ার খবর যখন ঢাকায় আসে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে ওঠে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী নয়, জগন্নাথ কলেজসহ স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যাপকভাবে সেসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সেটা নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন তখন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী খালেকুজ্জামান বললেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ যখন এই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন তখন বাঙালি লেখকরা তাদের লেখনীতে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই সময় লেখিকা মোহসেনা ইসলাম পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা কেন বাংলা হওয়া উচিত- এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এটি আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে নেই। আমার লেখা ‘ভাষার লড়াই ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’ বইয়ে সেই প্রবন্ধটি রয়েছে।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের পর করণীয় নির্ধারণে ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরিতে একটি সর্বদলীয় সভা আহ্বান করা হয়। সেখানে তৎকালীন ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে।’ ভাষা আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে ১৯৫২ সালের ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি ‘পতাকা দিবস’ পালিত হয়। এ সময় প্রায় ৫০০ পোস্টার লেখার দায়িত্ব দেয়া হয় নাদিরা বেগম ও শাফিয়া খাতুনকে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য ছাত্রীদের নিয়ে সে দায়িত্ব পালন করেন।

৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালনের জন্য দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ব্যাপক প্রস্তুতি চলে। এতে মেয়েদের বিরাট অংশগ্রহণ ছিল। লায়লা সামাদ, শামসুন নাহার, শাফিয়া খাতুন, সারা তৈফুর, রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা রহমান, হালিমা খাতুন, কায়সার সিদ্দিকী প্রমুখ ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বকশীবাজার কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ), মুসলিম গার্লস স্কুল, বাঙলা বাজার গার্লস স্কুল, কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলে গিয়ে মেয়েদের আন্দোলনের জন্য উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তের পর ছাত্রদের কয়েকটি দলে বের হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এরপর মেয়েদের একটি দল বের হয় যেখানে ছিলেন সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা বাচ্চু, শাফিয়া খাতুন, শামসুন্নাহার, সারা তৈফুরসহ বেশ কয়েকজন। পুলিশ তাদের ওপরও লাঠিচার্জ করে।

সেদিনের প্রসঙ্গে ভাষাসংগ্রামী জাতীয় অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্তের পর প্রথমে ছাত্রদের দুটি দল বের হয়। এরপর খবর আসে ওদের পুলিশ ধরেছে এবং লাঠিপেটা করেছে। কয়েকজনকে অ্যারেস্ট করে ট্রাকে তুলে নিয়ে গেছে। তখন সিদ্ধান্ত হয় মেয়েরা গেলে কী হয় দেখা যাক। মেয়েদের দলের প্রথমটিতে আমি ছিলাম। আমার সঙ্গে আরও ছিল ড. শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন নাহার প্রমুখ। বের হতেই দেখি সিটি এসপি মাসুদ মাহমুদ, ঢাকার ডিসি কোরেশী সাহেব। এসেম্বলি হলে যেতে চাইলে আমাদের বারণ করা হয়। একপর্যায়ে আমরা বের হলেই লাঠিচার্জ হয়। রওশন আরা বাচ্চুর পিঠে, আমার পায়ে লাঠিচার্জ হয়। এরপর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো ছাত্র-ছাত্রীরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে বেরিয়ে আসে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ অবিরাম গুলি ছুড়তে থাকে।

নারী ভাষাসংগ্রামীদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছি। কিন্তু ভাষাসংগ্রামী হিসেবে যে মর্যাদা সেটি সেভাবে আসেনি।’ ইতিহাস বলছে, ’৫২-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ইউনিয়নের সভাপতি শাফিয়া খাতুনের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের একটি সভা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আজিমপুুর কলোনির মেয়েরা প্রতিবাদ সভা করে, যেখানে কমলাপুরসহ অন্য এলাকা থেকে মেয়েরা যোগ দেন। ’৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এদিন ভোরে ফেস্টুন হাতে প্রভাত ফেরিতে অনেক ছাত্রী অংশ নেন। যার মধ্যে ফরিদা বারী মালিক, জহরত আরা, খালেদা ফেন্সী খান অন্যতম।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে ধর্মঘট পালিত হয়। নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নাম মমতাজ বেগম। তাকে পুলিশি নির্যাতন থেকে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি খুলনায় করনেশন গার্লস কলেজের ছাত্রীরা স্কুলের দেয়ালে বাংলা ভাষার পক্ষে পোস্টার লাগান। বরিশালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবুল হাশেমের অনুরোধে জগদীশ সারস্বত উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রানী ভট্টাচার্য এদিন স্কুলের মেয়েদের নিয়ে বিরাট এক মিছিল বের করেন। একই দিন রাজশাহীতে হরতাল পালিত হয়। বিকালে ভুবন মোহন পার্কে ডা. এমএমএ গাফ্ফারের সভাপতিত্বে জনসভা হয়, যেখানে ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’ গানটি গেয়ে শোনান জাহানারা বেগম। পরদিন প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে চোঙ্গা নিয়ে প্রচারণা চালান হাফিজা বেগম টুকু, ফিরোজা বেগম ফুনু, হাসিনা বেগম টুকু। সিলেটে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী, সৈয়দা সাহার বানু চৌধুরী, সৈয়দা লুৎফুন্নেছা বেগম, সৈয়দা নজিবুন্নেছা বেগম, রাবেয়া খাতুনের নাম উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে মিরা সেন, জাহানারা রহমান, জওশন আরা রহমান, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, হোসনে আরা মাক্ষী নামগুলো জড়িয়ে আছে। আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে পোস্টার লেখা, লাগানো নানা কার্যক্রমে তারা অংশ নিয়েছিলেন। নারী ভাষাসংগ্রামী প্রতিভা মুৎসুদ্দি ভাষা সংগ্রামীদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি একুশে পদক পেয়েছি শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য, ভাষাসংগ্রামী হিসেবে নয়। সেই অর্থে কোনো চাওয়াও ছিল না, চাইনি। তবে দুঃখ হয় মাতৃভাষার জন্য যে লড়াই সেই বাংলা আজও সর্বস্তরে চালু হয়নি।’ ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, বিভিন্ন জেলা শহরে ঘুরে আমি নারী ভাষাসংগ্রামীদের তথ্য নিয়েছি। দেখেছি গণমানুষের কাছে, সমাজে তারা মূল্যায়িত হয়েছেন। মানুষ তাদের সম্মান করে। তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় যেকোনো বিষয়ে পুরুষের প্রসঙ্গ আগে আসবে এটাই স্বাভাবিক।

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
[tabs]